দিল্লির চাণক্যপুরি এলাকায় ডিসেম্বরের শেষ রাত। ঘন কুয়াশায় ঢাকা কূটনৈতিক পাড়া তখন প্রায় নিস্তব্ধ। রাস্তাঘাট ফাঁকা, আলো ম্লান। ঠিক সেই নীরবতার মধ্যেই হঠাৎ শুরু হয় ভয়াবহ স্লোগান আর উত্তেজনা।
একদল লোক হাতে জ্বলন্ত মশাল ও মুখে মুখোশ পরে বাংলাদেশের হাই কমিশনের মূল ফটকের সামনে এসে জড়ো হয়। তারা উচ্চস্বরে বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তারা নিজেদের পরিচয় দেয় অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র সেনা নামের একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হিসেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভারতের সবচেয়ে সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত চাণক্যপুরিতে তারা কোনো দৃশ্যমান বাধা ছাড়াই প্রবেশ করে। এই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সসহ একাধিক দেশের দূতাবাস অবস্থিত। সাধারণ মানুষের প্রবেশ যেখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে প্রায় ২৫ জন উগ্রবাদীর এভাবে ঢুকে পড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে নিয়ে প্রকাশ্যে হুমকিমূলক স্লোগান দেয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়। দিল্লির কূটনৈতিক অঞ্চলে এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তবে এই ঘটনা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বড় কূটনৈতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে নাকি এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো উগ্র গোষ্ঠীর তৎপরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ধীরে ধীরে কূটনৈতিক আচরণেও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাণক্যপুরির মতো এলাকায় এমন ঘটনা শুধুই নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়। এটি নীরব রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের ইঙ্গিতও দিতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া না থাকলে এমন ঘটনাগুলো বার্তা হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার পর দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে পারছে, দিল্লির রাজনীতিতে ধর্ম ও কূটনীতি ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ এখন আর নীরব পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকতে চায় না বলে ইঙ্গিত মিলছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃঢ় অবস্থান নিলে তা শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নৈতিক বার্তা হতে পারে।
চাণক্যপুরি এখন আবার শান্ত। বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে সেই নীরবতার আড়ালে রয়ে গেছে ভয়, অস্বস্তি এবং সন্দেহ। এই ঘটনা কি শুধুই এক রাতের উত্তেজনা, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার সূচনা, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।
sabbir422
আমি একজন web Developer এবং News Blogger । আমি ৫ বছর ধরে News Blog পরিচালনা করে এসেছি