বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে নরেন্দ্র মোদি সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা এখন উল্টো ভারতের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার কৌশল আর বাংলাদেশকে কোণঠাসা করার চেষ্টা এই দুই নীতির ফল এখন গিয়ে ঠেকেছে ভারতের ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে। অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে সেই গর্তে নিজে পড়ার আশঙ্কা থাকে মোদি প্রশাসনের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভিসা ও কনসুলার সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভারতের আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশ তাদের অন্যতম বড় ও নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার। হঠাৎ করে ভিসা সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা, বিনিয়োগ, যাতায়াত এবং পারস্পরিক আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং আগরতলার সহকারী হাই কমিশনের ভিসা ও কনসুলার কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণার পর থেকেই ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। কলকাতার তৈরি পোশাক খাত, কাঁচামাল আমদানি, কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বছরের এই সময়টা বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি থেকে ঈদ পর্যন্ত সময়কে তারা ব্যবসার ‘পিক সিজন’ হিসেবে দেখেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক, তুলা, সবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য ভারতে আমদানি হয়। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে যায় প্রক্রিয়াজাত চামড়া, খাদ্যপণ্য, পোল্ট্রি ফিডসহ নানা পণ্য। কলকাতার কাউন্সিল অফ লেদার এক্সপোর্টস (পূর্বাঞ্চল) জানিয়েছে, প্রতিবছর শুধু কলকাতা লেদার কমপ্লেক্স ও কসবা ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানি করা হয়, যা ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
চামড়া একটি প্রাকৃতিক পণ্য হওয়ায় প্রতিটি চালানের মান ভিন্ন হয়। তাই আমদানির আগে সরাসরি বাংলাদেশে গিয়ে কারখানা ও পণ্যের মান যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু ভিসা বন্ধ থাকলে সরাসরি পরিদর্শন সম্ভব নয়। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ছে ভারতীয় শিল্পকারখানাগুলো। অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, চীনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার সময় যে ধরনের ক্ষতি হয়েছিল, এবার পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার নিতে পারে।
রপ্তানি খাতের প্রতিনিধিরাও ইতোমধ্যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানির ভরা মৌসুম চলছে। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৬০ টন তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এক সময় একটি বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের কার্গো ফ্লাইট নিয়মিত শুধু পোশাক পরিবহন করত। অথচ ভিসা সংকটের কারণে নতুন ফ্লাইট বাড়ানোর বদলে উল্টো ফ্লাইট কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে বাণিজ্যে এমনিতেই মন্দা দেখা দিয়েছিল। আগে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১,৬০০ ট্রাক বাংলাদেশে যেত, যা বর্তমানে নেমে এসেছে প্রায় ৮০০ ট্রাকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ভিসা স্থগিত থাকলে সেই যোগাযোগ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক মূলত আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী, রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত দুই দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভিসা সংকটের সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
এদিকে ভিসা সংকটের প্রভাব পড়তে পারে বিমান পরিবহন খাতেও। কলকাতা–ঢাকা রুটে যাত্রী কমে গেলে ফ্লাইট সংখ্যা কমানোর ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক এয়ারলাইন্স। সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে নেওয়া সিদ্ধান্তই এখন ভারতের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে এই সংকট কত দ্রুত এবং কীভাবে সমাধান হয়।
sabbir422
আমি একজন web Developer এবং News Blogger । আমি ৫ বছর ধরে News Blog পরিচালনা করে এসেছি