২০০৭ সালের জানুয়ারি। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ওয়ান–ইলেভেন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে ভয় ও আতঙ্কের ছায়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমেদ ও সেনাপ্রধান মইনউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে শুরু হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দুই মাসেই গ্রেপ্তার হন ১৫০ জনের বেশি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী।
তখন থেকেই জল্পনা চলছিল বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন। সেই জল্পনার অবসান ঘটে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ, যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাত্র ছয় মাস আগেও যিনি ছিলেন সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ও জনপ্রিয়, গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে নেমে আসে নাটকীয় মোড়।
গ্রেপ্তারের পর যেভাবে তাকে আদালতে হাজির করা হয়, তা দেশবাসীকে বিস্মিত করে। র্যাবের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে ঢাকার একটি আদালতে তোলা হয় তাকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয় ১০ দিনের রিমান্ড।
এরপরই তারেক রহমান ও বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে রিমান্ডে তার উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, রিমান্ডের সময় তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৮ ঘণ্টা হাত ও চোখ বেঁধে রাখা হয়। কখনো ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে আবার ফেলে দেওয়া হয়, চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। কারাবন্দি অবস্থায় এই অভিযোগ দলীয়ভাবে তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
দীর্ঘ কারাবাস শেষে তারেক রহমান যখন মুক্তি পান, তখন তার শারীরিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। হাঁটতে পারছিলেন না, হুইলচেয়ারই ছিল তার চলাচলের একমাত্র ভরসা। বিএনপি দাবি করে, নির্যাতনের কারণে তার জীবননাশের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছিল।
২০১৫ সালের ৫ আগস্টের পর বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়ান–ইলেভেন সরকার সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন—
“এক কথায় বলতে গেলে, ১/১১ সরকার ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসৎ উদ্দেশ্যের সরকার। তারা দেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল।”
তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর, একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেপ্তার হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি দুই ছেলেকে নিয়ে দেশের বাইরে চলে যেতে পারেন। কিন্তু সব অনুমান ভুল প্রমাণ করে তিনি দেশে থেকেই আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০০৮ সালের শুরুতেই আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের পথে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সেনা কর্মকর্তারা কারাগারে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। তবে দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর মুক্তি ছাড়া কোনো আলোচনায় রাজি হননি তিনি।
একপর্যায়ে সেনা কর্মকর্তারা ছোট ছেলে কোকোর মুক্তিতে সম্মত হলেও তারেক রহমানের বিষয়ে অনড় থাকেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার কাছে দুই ছেলের মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসাই ছিল চূড়ান্ত শর্ত। শেষ পর্যন্ত সেই পথেই সমঝোতা হয়।
১৩টি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ১৮ মাস কারাবাস শেষে মুক্তি পান তারেক রহমান। মাত্র আট দিন পর, ১১ সেপ্টেম্বর, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লন্ডনের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। একই দিন কারাগার থেকে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। ছেলেকে দেখতে পিজি হাসপাতালে যাওয়ার সময় তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
তারেক রহমানের দেশত্যাগের পর গুঞ্জন ছড়ায় তিনি পদত্যাগ করেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা করে দেশ ছেড়েছেন কিংবা তিন বছর রাজনীতি না করার শর্তে স্বাক্ষর দিয়েছেন। এসব কথার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজও মেলেনি।
প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের মতে, বেগম খালেদা জিয়া বুঝেছিলেন তৎকালীন সময়ে তারেক রহমান মুক্তি না পেলে হয়তো আর কখনোই দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না।
২০১২ সালে তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন এবং এক বছরের মধ্যেই তা মঞ্জুর হয়। ২০০৮ থেকে ২০২৫ দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন তিনি। এই সময়ে লন্ডন থেকেই বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আবেগ, প্রত্যাশা ও আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো নেতার প্রবাস জীবন ও দেশে ফেরাকে ঘিরে এমন ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার নজির খুব কমই রয়েছে।
sabbir422
আমি একজন web Developer এবং News Blogger । আমি ৫ বছর ধরে News Blog পরিচালনা করে এসেছি